কিছু কিছু মানুষরে আমরা যত বড় হই, ততই বুঝি—তাগো জায়গাটা আমাদের জীবনে কতখানি গভীর ছিল।

আমার নানা ভাই তেমনই একজন মানুষ।

নানার লগে আমার কত স্মৃতি যে জমা আছে, তার কোনো হিসাব নাই। ছোটবেলার সেই দিনগুলা এখন মনে হয়, জীবনটার সবচেয়ে সুন্দর দিন আছিল। তখন এত ব্যস্ততা আছিল না, এত হিসাব-নিকাশ আছিল না। ছিল শুধু হাসি, দুষ্টুমি, গ্রামের মেঠোপথ আর আপন মানুষগুলার ভালোবাসা।

আমার নানা ভাই আছিল বড়ই রসিক মানুষ। নানার লগে বসলে হাসি-ঠাট্টা না কইরা থাকা যাইত না। বিশেষ কইরা নানার শ্বশুরবাড়ি নিয়া তো আমার লগে কত আমোদ হইছে!

নানার শ্বশুরবাড়ির কথা উঠলেই আমি সুযোগ খুঁজতাম একটু খোঁচা দেওনের। আর নানা ভাইও কম যাইতেন না—হাসতে হাসতে এমন সব কথা কইতেন, মনে হইত গ্রামের উঠানটাই যেন হাসিতে ভইরা গেছে।

এখনো সুযোগ পাইলে নানার লগে সেইসব কথা নিয়া আমোদ করি।

তবে নানার লগে আমার সবচেয়ে মায়াময় স্মৃতিগুলার একটা জড়াইয়া আছে গরুর মাংসের লগে।

নানা হাটে যাইতেন। হাট থেইকা গরুর মাংস কিনা আনতেন—মাথার মাংস, জিহ্বার মাংস, পায়ের হাড়… আহা!

মাংস নিয়া বাড়ি ফিরলেই কোনো একসময় আমারে কইতেন,
**“চল, রাতে মাংস খাইতে যামু।”**

ছোট মানুষ আমি। নানার লগে যাওনের আনন্দে তখন মনটা কেমন জানি নাচত।

রাতের সেই খাওয়া—হয়তো কোনো বড় আয়োজন আছিল না। ছিল মাটির গন্ধ, গ্রামের রাত, আপনজনের হাসি আর নানার পাশে বসে খাওয়ার আনন্দ।

আজ কত দামি খাবার খাই, কত বড় বড় জায়গায় যাই—কিন্তু সেই রাতের খাবারের স্বাদ আর কোনোদিন পাই নাই।

কারণ ওই খাবারে শুধু মাংসের স্বাদ আছিল না, আছিল নানার ভালোবাসা।

আর নানী…

নানীর কথা মনে হইলেই বুকের ভিতর কেমন জানি একটা টান লাগে।

ছোটবেলায় আমি নানীর বুকের দুধ খাইছি। তাই নানীর লগে আমার সম্পর্কটা হয়তো একটু অন্যরকম। নানীর আদর, নানীর কোলে শুইয়া থাকা, নানীর সেই পরিচিত গন্ধ—এইসব জিনিস মানুষের মনে কোথায় যেন চিরদিনের জন্য জমা হইয়া থাকে।

আমার কাছে নানী শুধু নানী না—আমার শৈশবের একটা বড় অংশ।

আর নানার সামনে নানী আছিল যেন আলাদা এক ক্ষমতা! 😄

আমার সামনে নানা নানীকে কিছু কইতে পারতেন না। নানী কিছু কইলে নানা চুপ। আর আমি সেই দৃশ্য দেইখা মনে মনে মজা লইতাম।

মনে হইত,
**“এই মানুষটাই তো বাইরের দুনিয়ায় এত রসিক, কিন্তু নানীর সামনে আইলেই একেবারে চুপ!”**

সময় বড় অদ্ভুত জিনিস।

যে বাড়িতে আগে কতবার যাওয়া হইত, সেই বাড়িতে এখন ব্যস্ততার কারণে আগের মতো যাওয়া হয় না। কাজের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, জীবনের হাজারো ব্যস্ততা—সব মিলাইয়া কেমন জানি দূরত্ব তৈরি হইয়া গেছে।

কিন্তু মানুষ কি আসলেই দূরে যায়?

না।

মানুষ দূরে যায়, পথ দূরে যায়, সময় দূরে যায়—কিন্তু মায়া দূরে যায় না।

আজও কোনো শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়তে যাইতে যাইতে যদি নানার বাড়ির কথা মনে পড়ে, বুকের ভিতর থেইকা সেই পুরোনো দিনগুলা উঁকি দেয়।

মনে হয়, আবার যদি সেই ছোটবেলায় ফিরতে পারতাম!

আবার যদি হাট থেইকা নানা মাংস নিয়া বাড়ি ফিরতেন…

আবার যদি কইতেন,
**“চল, রাতে মাংস খাইতে যামু।”**

আবার যদি নানীর কাছে গিয়া চুপচাপ বসতে পারতাম…

আবার যদি উঠানের এক কোণে বসে নানার শ্বশুরবাড়ি নিয়া একটু আমোদ করতে পারতাম!

কিন্তু সময় তো আর পেছনে ফেরে না।

ফেরত আসে শুধু স্মৃতি।

এই ছবিটাও তেমনই এক স্মৃতি।

কোনো এক শুক্রবার, জুমার নামাজ পড়তে যাওনের সময় তোলা এই ছবি। ছবিটা হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু আমার কাছে এই ছবির ভিতর লুকাইয়া আছে অনেক দিনের গল্প—নানা, নানী, গ্রামের বাড়ি, শৈশব আর সেইসব দিন, যেই দিনগুলা এখন শুধু মনে পড়ে।

জীবন আমাদের অনেক কিছু দেয়, আবার অনেক কিছু চুপচাপ কাইড়া নেয়।

শুধু কিছু মানুষরে কাইড়া নিতে পারে না—তাগো জায়গা থাকে আমাদের বুকের ভিতর।

**নানা ভাই, নানী—তোমরা আমার শৈশবের সেই উঠান, যেই উঠানে আজও মনটা মাঝে মাঝে দৌড়াইয়া যায়।**

হয়তো এখন আর আগের মতো যাওয়া হয় না।
হয়তো আগের মতো সময়ও নাই।
কিন্তু তোমাদের জন্য মায়াটা এখনো ঠিক আগের মতোই আছে।

গ্রামের মেঠোপথে সন্ধ্যার বাতাসের মতো,
পুরোনো উঠানের গন্ধের মতো,
আর নানার হাট থেইকা আনা সেই গরুর মাংসের গন্ধের মতো—

**কিছু স্মৃতি কোনোদিন পুরোনো হয় না।** ❤️

— **মোঃ শামীম আশরাফ**