জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের উলিয়া গ্রাম। এক পাশে সবুজ-শ্যামল মাঠ, অন্য পাশে বিশাল যমুনা নদী। যমুনার ঢেউয়ের শব্দ, নৌকার মাঝির ডাক আর গ্রামের মানুষের সহজ-সরল জীবন—এই পরিবেশের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে আব্দুল আলীম।
আলীম আমার চাচাতো শ্যালক।

ছবি: আব্দুল আলীম ও মো: শামীম আশরাফ
ছোটবেলা থেইকাই উলিয়ার মাটি, মানুষের ভালোবাসা আর যমুনার বাতাস তার আপন। সে অন্য সবার চাইতে একটু আলাদা। তার ডাউন সিনড্রোম আছে। কিন্তু আলীমরে শুধু তার এই পরিচয় দিয়া বিচার করলে আলীমরে আসলে চেনাই হবে না।
আলীম খুব সহজ-সরল, হাসিখুশি আর আপনমনা মানুষ।
তবে আলীম একটা কথা স্পষ্ট কইরা মুখে বলতে পারে না। তার কথাগুলো অনেক সময় অস্পষ্ট শোনায়। কিন্তু তাই বইলা আলীম যে কিছু বুঝে না—এমনটা একদমই না।
বরং আলীমের একটা আলাদা ভাষা আছে—ইশারার ভাষা।
সে হাত দিয়া দেখায়, চোখের ইশারা করে, মুখের ভঙ্গি বদলায়—আর যারা তার সঙ্গে থাকে, তারা ধীরে ধীরে তার সেই ভাষা বুঝতে শিখে গেছে।
কখনো সে কোথাও যেতে চাইলে হাত দিয়া রাস্তার দিকে দেখায়।
কিছু খাইতে চাইলে খাবারের দিকে তাকায় বা হাত দিয়া বুঝায়।
কাউরে ভালো লাগলে হাসিমুখে তার কাছে যায়।
আবার কোনো কিছু পছন্দ না হইলে মুখের ভাব আর হাতের ইশারাতেই পরিষ্কার কইরা দেয়—“এইটা আমি চাই না।”
মজার ব্যাপার হইলো, আলীমের সঙ্গে কিছুদিন থাকলে তার কথা বুঝতে মুখের শব্দের খুব বেশি দরকার হয় না।
তার চোখ কথা কয়।
তার হাত কথা কয়।
তার হাসি কথা কয়।
তার অভিমানও কথা কয়।
একদিন গ্রামের পথে আলীমরে দেখা গেল। পরিচিত একজন তাকে জিগাইল,
—“আলীম, কই যাস?”
আলীম মুখে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কথাটা পরিষ্কার হইলো না। তারপর হাত দিয়া সামনে একটা জায়গা দেখাইলো।
লোকটা বুঝতে পারল না।
আলীম আবার ইশারা করল। এবার একটু জোর দিয়া।
শেষে লোকটা বুঝল—আলীম ওই দিকেই যেতে চায়।
সে হেসে বলল,
—“ও আচ্ছা! ওইদিকে যাইবি?”
আলীমও তখন দাঁত বের কইরা একটা হাসি দিল।
এই হাসিটাই আলীমের সবচেয়ে সুন্দর ভাষা।
আলীম নিজের মতো কইরা কাজ করতে ভালোবাসে। কেউ যদি তাকে কোনো কাজ বুঝাইয়া দেয়, সে অনেক সময় নিজের মতো করে সেটা করার চেষ্টা করে। হয়তো আমাদের চোখে তার পদ্ধতিটা একটু আলাদা, কিন্তু তার নিজের কাছে সেটাই স্বাভাবিক।
কেউ তাকে তাড়া দিলে সে হয়তো বিরক্ত হয়। কিন্তু ভালোভাবে বুঝাইয়া বললে, একটু সময় দিলে, সে নিজের মতো করে কাজটা করতে চায়।
এই জায়গাটাতেই আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে।
আমরা অনেক সময় ভাবি—যে মানুষ স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে না, সে হয়তো কিছু বুঝে না।
কিন্তু আলীম আমাদের সেই ভুল ধারণাটা ভেঙে দেয়।
কথা বলতে না পারা আর কথা বুঝতে না পারা এক জিনিস নয়।
আলীম হয়তো মুখে তার মনের কথা সুন্দর করে বলতে পারে না। কিন্তু সে অনুভব করে। সে ভালোবাসা বোঝে। সে আদর বোঝে। সে অবহেলাও বোঝে।
কেউ ভালোভাবে তার সঙ্গে কথা বললে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
কেউ বিরক্তি দেখালে তার মুখটা মলিন হয়ে যায়।
তাই আলীমের মতো মানুষদের সঙ্গে আমাদের আরও ধৈর্য ধরতে হবে। তার কথা শেষ করার সুযোগ দিতে হবে। তার ইশারা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। তাকে নিয়ে হাসাহাসি না করে তার পাশে দাঁড়াতে হবে।
কারণ একজন মানুষের মুখের ভাষা অস্পষ্ট হইতে পারে, কিন্তু তার মনের ভাষা অস্পষ্ট না-ও হইতে পারে।
যমুনার পাড়ে দাঁড়াইয়া আলীম যখন নদীর দিকে তাকায়, তখন কে জানে তার মনের ভিতরে কী কথা চলে!
হয়তো সে নদীর ঢেউ দেখে আনন্দ পায়।
হয়তো নৌকা দেখে কোথাও যেতে চায়।
হয়তো শুধু বাতাসটা উপভোগ করে।
সে হয়তো এসব মুখে বলতে পারে না।
কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়—সে অনেক কিছুই বুঝতেছে।
এই জন্যই আমাদের সমাজের প্রত্যেক মানুষের প্রতি একটু মায়া, একটু মমতা আর অনেক বেশি সম্মান থাকা দরকার।
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষ কিংবা যেকোনো ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে দয়া করে দূরে সরিয়ে রাখা নয়; বরং ভালোবাসা দিয়ে সমাজের অংশ করে নেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
তাদের নিয়ে হাসাহাসি নয়।
তাদের দুর্বল ভাবা নয়।
তাদের বোঝা মনে করা নয়।
বরং তাদের কথা মন দিয়ে শোনা, তাদের ইশারা বোঝার চেষ্টা করা এবং তাদের নিজেদের মতো করে বাঁচার সুযোগ দেওয়া দরকার।
আলীম আমাদের সেটা প্রতিদিন শেখায়।
সে হয়তো মুখে স্পষ্ট করে বলতে পারে না—
“আমি তোমাদের ভালোবাসি।”
কিন্তু তার একটা হাসি, একটা ইশারা, একটা মায়াভরা দৃষ্টি যেন প্রতিদিন সেই কথাটাই বলে যায়।
যমুনার পাড়ের উলিয়া গ্রামের সেই সহজ-সরল ছেলে আব্দুল আলীম তাই শুধু একজন মানুষ নয়—সে আমাদের জন্য একটা নীরব শিক্ষা।
সব কথা মুখে বলতে হয় না।
কিছু কথা চোখে বলা যায়,
কিছু কথা ইশারায় বলা যায়,
আর কিছু কথা শুধু ভালোবাসা দিয়েই বোঝা যায়।
আলীমের মুখের ভাষা হয়তো স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার হৃদয়ের ভাষা খুবই স্পষ্ট—
সে ভালোবাসতে জানে।
আর আমাদের কাজ হলো সেই ভালোবাসার ভাষাটা বুঝতে শেখা।